স্পেনে মৃত আমেরিকানদের কথা মনে করে

আজ এই রাতে মৃতরা ঠান্ডায় সিঁটিয়ে গিয়ে ঘুমোয়। তুষার বইছে জলপাই বাগানের মধ্য দিয়ে, ঝরে যাচ্ছে শিকড়ের আঁকি বুঁকি ছাঁকনির মধ্য দিয়ে। স্মৃতিফলকলাঞ্ছিত কবরস্তূপের উপর দিয়ে উড়ে চলেছে তুষার (স্মৃতিফলকের সময় ছিল একদিন!) জলপাই গাছগুলি এই শীতের হাওয়ায় কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া দেখায়। ট্যাঙ্কগুলি গোপন করার জন্য নিচের দিকের ডালপালা কেটে নেওয়া হয়েছিল। জারামা নদীর উপরে ছোট টিলাগুলিতে এখন মৃতেরা ঘুমোচ্ছে ঠান্ডায় সিটিয়ে গিয়ে। সেই ফেব্রুয়ারি মাসের শীতে ওরা মাটি নিয়েছে, আর তারপর থেকে কত-যে ঋতুচক্র পার হল তার হদিশ আর ওরা রাখেনি।

আজ থেকে ছ-বছর আগে জারামার চড়াই সাড়ে চার মাস দখলে রেখেছিল লিঙ্কন ব্যাটেলিয়ান। আর স্পেনের মাটিতে মাটি হয়ে মিশে গেছে প্রথম আমেরিকান মৃতদেহটি ঢের দিন আগে।

আজ এই রাতে ঠান্ডায় সিটিয়ে গিয়ে মৃতরা স্পেনে ঘুমোচ্ছে—সারাটা শীত জুড়ে ওরা ঘুমন্ত মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে ঘুমোবে। আবার বসন্তের বৃষ্টিপতন মাটিকে করে তুলবে করুণাময়ী। দক্ষিণের পাহাড় পার হয়ে বইবে ঝুরু ঝুরু মলয় বাতাস। কালো গাছগুলোয় ছোট ছোট পল্লবে হেসে উঠবে জীবন। জারামা নদীর পাড় ঘেঁষে আপেল গাছগুলিতে মঞ্জরী ধরবে। এই বসন্তে মৃতরা অনুভব করবে, আবার মাটিতে ফিরে এসেছে প্রাণের স্পন্দন।

কেননা আমাদের মৃতরা আজ হিস্পানি মৃত্তিকারই অংশ, আর স্পেনের মাটির মৃত্যু নেই। প্রতি শীতে মনে হবে যেন তা মৃত, তবু প্রতি বসন্তে তা প্রাণ পেয়ে জেগে উঠবে। আমাদের মৃতরা চিরকাল প্রাণময় রইবে তারই সঙ্গে।

মাটির যেমন মৃত্যু নেই, তেমনি যে একবারও স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে—সে কখনো আর দাসত্বে ফেরে না। যেখানে আমাদের মৃতরা শুয়ে, ওখানে চাষীরা কাজ করছে। ওরা জানে কেন তারা মরণকে বরণ করে নিল। যুদ্ধের সময় তো এমন দিনই ছিল ঐ সব শিক্ষা নেবারই। আর চিরদিনের জন্য তারা মনের গভীরে বহন করবে এই জ্ঞান।

হিস্পানি চাষী, হিম্পানি মজুর সেইসব ভালোমানুষ, সাধারণ সৎ মানুষ, যারা স্পেনের প্রজাতন্ত্রের প্রতি আস্থা রেখেছিল, লড়াই করেছিল তারই জন্য, তাদের হৃদয়ে তাদের মনে বেঁচে রইবে আমাদের মৃতরা। আর আমাদের মৃতরা যতদিন স্পেনের মাটিতে জীবিত থাকবে, যতদিন পৃথিবী বেঁচে থাকবে, ততদিন অত্যাচারের কোনো জমানাই স্পেনে টিকতে পারবে না।

ফ্যাসিস্তরা মাটির উপরে ছড়িয়ে পড়তে পারে, ভিনদেশ থেকে আনা ধাতুপিণ্ডের চাপে পথ করে নিয়ে। বেইমান আর ভীরুদের সাহায্যে তারা এগোতে পারে। তারা শহর গ্রাম জনপদ ধ্বংস করতে পারে। জনগণকে দাসত্বে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করতে পারে।

হিস্পানি জনগণ আবার উঠে দাঁড়াবে, আগেও যেমন তারা রুখে দাঁড়াত অত্যাচারের মুখোমুখি।

মৃতদের আর উঠে দাঁড়াবার কিইবা প্রয়োজন। তারা এখন মাটির মধ্যে মাটি হয়ে আছে আর মাটিকে কখনও জয় করা যায় না। কেননা পৃথিবী সর্বংসহা। অত্যাচারের তাবৎ জমানা সে পার হয়ে যায়।

যারা মৃত্তিকায় প্রবেশ করেছে এমন মহিমায়, যারা স্পেনে শহীদ হল তাদের চেয়ে কেউ বেশি সম্মান নিয়ে মাটি নেয়নি কোনো কালে, তারা তো ইতোমধ্যেই অমরত্বে পৌঁছে গেছে।

[হেমিংওয়ে পাঁচ দিন ধরে তিন হাজার শব্দে এই রচনাটি লেখেন—তারপর কেটে-ছেঁটে অমোঘ রূপটি দেন, যা বহু ভাষায় অনূদিত হয়। বহু ভাষায় এর রেকর্ডও আছে। লেখাটি নিউ ম্যাসেস (সেভেন সিজ বুকস) সংকলন থেকে অনুবাদ করা হয়েছে।—অনুবাদক]

সেকেলে ফ্যাসিবাদ, দ্যু প্রকাশন, নভেম্বর ২০২৪

পরিচয়, ফ্যাসিস্টবিরোধী সংখ্যা, মে-জুলাই ১৯৭৫

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice